জমজম কূপ | zamzam well | Need to know
জমজম কূপ
- পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানির উৎস জমজম কূপ।
হাজার বছর আগে শুরু হওয়া পবিত্র জমজম কূপের পানি বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করছে। মুসলমানদের কাছে জমজমের পানি অত্যন্ত বরকতময় ও পবিত্র। বৈজ্ঞানিকভাবেও জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে স্বীকৃত। মক্কা মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী থেকে প্রতিদিন প্রায় 20 লক্ষ গ্লাস জমজমের পানি পান করা হয় ।
পবিত্র কাবা ঘর থেকে মাত্র 21 মিটার দূরত্বে অবস্থিত আল্লাহর কুদরতের বাস্তব নিদর্শন জমজম কূপ। কাবা ঘরের সামনে হাযরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহীম এর মাঝ বরাবর রয়েছে জমজম কূপ। বর্তমানে জমজম কূপ মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত। হাদিসে এই পানির অশেষ কল্যাণ ও বরকতের কথা উল্লেখ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস মতে ভূপৃষ্ঠে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর পানি জমজম কূপের পানি। এইপানি ক্ষুধাও জন্য খাদ্য ও রোগীর জন্য পথ্য। জমজম কূপের পানির এই বিশেষত্ব বর্তমানে বিজ্ঞান দাঁড়াও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানি। শুধু তাই নয় এর সমান সম্পন্ন পানি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাধারণত যে কোন কূপের পানি দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকার ফলে তার রং ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু হাজার হাজার বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও জমজমের পানি রয়েছে সম্পূর্ণ অবিকৃত।
এর রং স্বাদ ও বিশুদ্ধতায় সামান্যতম কোন পরিবর্তন আসেনি। এই পানিতে কোন জীবাণু শৈবাল ছত্রাক বা পানি দূষণ কারী কোন ধরনের বস্তু টিকতে পারেনা। কোন নদী বা জলাশয় এর সঙ্গে এই গ্রুপের কোন সংযোগ নেই। অথচ প্রতিমুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ এই পানি ব্যবহার করছে আবার অনেকেই সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। তবুও জমজম কূপ কখনো শুকিয়ে যাবে না এবং এ পানি কখনো নষ্ট হবে না।
আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরা ও আদরের পুত্র ইসমাইলকে মক্কার বিরান পাহাড়ি এলাকার নির্বাসনে রেখে আসেন। এই নির্বাসন ছিল আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সবচেয়ে প্রিয় কোন কিছুর কুরবানী। এক মগ পানি ও স্থলে খেজুর সহ তাদেরকে বিরান মরুভূমিতে রেখে তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করেন। ফলে মক্কার বালুময় প্রান্তরে একাকী বসবাস করতে থাকেন মা হাজেরা ও তার শিশু ইসমাইল। তাদের স্বল্প রসদ অতি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একদিন নিদারুণ পিপাসায় শিশুপুত্র ইসমাইলকে খোলা প্রান্তরে রেখে মা হাজেরা সাফা মারওয়া পাহাড়ের ছোটাছুটি করতে থাকেন। সাতবার তিনি এদিক থেকে ওদিক ছুটে বেড়ান।
একপর্যায়ে আল্লাহর হুকুমের হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মরুভূমির ভেতর থেকে পানির ঝরনা প্রবাহিত করে দেন। মা হাজেরা পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর কাছে এসে দেখলেন এক অভূতপূর্ব ঘটনা। শিশুপুত্র ইসমাইলের পায়ের আঘাতে শুকনো জমিতে তৈরি হয়েছে বিশুদ্ধ পানির স্রোত। তখন মা হাজেরা পানির চারদিকে বালির বাঁধ দিয়ে বললেন জামজাম অর্থাৎ থেমে যাও। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত জমজম কূপ বহাল রয়েছে এবং কিয়ামত জয়ন্ত থাকবে বলে মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাস।
জমজম কূপের গভীরতা মাত্র 101 ফুট। কূপের পানির স্তর মাটি থেকে প্রায় সাড়ে দশ ফুট নিচে অবস্থিত। দুটি বিশাল আকারের পানির পাম্পের সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে 1100 লিটার থেকে 1850 লিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন করা হয়। পানি উত্তোলন করার পর এর স্তর 44 ফুট নিচে নেমে যায় কিন্তু পানি উঠানো বন্ধ করার মাত্র 11 মিনিট পরেই আবার ও পানির স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে। জমজমের পানির চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকায় পানি সরবরাহের সৌদি কর্তৃপক্ষ রীতিমত হিমশিম খায়। তাই 2010 সালে মক্কার কাদায় এলাকায় জমজমের পানি সরবরাহের জন্য বিশাল এক প্রকল্প তৈরি করা হয়। সৌদি আরব সহ অন্যান্য প্রান্তে জমজমের পানি পৌঁছে দেয়ার জন্য এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমজমের পানি বোতল জাত করা হয়। এখান থেকে প্রতিদিন সরবরাহ করা হয় 1 লাখ 50 হাজার লিটার জমজমের পানি। হজের মৌসুমে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় দৈনিক 4 লক্ষ লিটারে। এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন 10 লিটার এর প্রায় 15 লক্ষ বোতল জমজম পানি সংরক্ষণ করা হয় ।
কিছু কিছু স্থানে জমজমের পানি শীতলীকরণ করেও পরিবেশন করা হয়। মুসল্লিও দর্শনার্থীরা যাতে নিজেদের প্রয়োজনে জমজমের পানি নিয়ে যেতে পারে সে জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। এছাড়া মক্কা ও মদীনার 2 মসজিদের মুসল্লিদের সুবিধার্থে বহু স্বেচ্ছাসেবক জমজমের পানি পিঠে বহন করে সরাসরি পরিবেশন করে থাকে। সেই সাথে বিভিন্ন ছোট ছোট বোতলজাত পানি ও সরবরাহ করা হয়। সৌদি আরব সহ অন্যান্য মুসলিম দেশে বাণিজ্যিকভাবে জমজমের পানির মজুদ ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দুই পবিত্র মসজিদের অসংখ্য কর্মী সাধারণ মানুষের কাছে জমজমের পানি পৌঁছে দেওয়া ও এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
জমজমের পানি নিয়ে এখনো পর্যন্ত বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। সৌদি আরবের জিওলজিক্যাল সার্ভে অধীনে জমজম স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ সেন্টার নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সল্ট এর পরিমাণ বেশি। যা ক্লান্তি দূর করতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে জমজমের পানি মানুষের স্বাস্থ্য জন্য শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি মাসারু এমাটু নামের জাপানি এক পানি গবেষক জমজমের পানি গবেষণা করে বলেছেন জমজমের এক ফোঁটা পানির যে নিজস্ব খনিজ গুনাগুন আছে তা পৃথিবীর অন্য কোন পানিতে নেই। তার গবেষণায় আরো দেখা যায় পৃথিবীর সাধারন পানির তুলনায় জমজমের পানি 1000 গুন বিশুদ্ধ। আর তাই 1000 ফোঁটা সাধারন পানির সাথে যদি এক ফোটা জমজমের পানি মেশানো হয় তাহলে সেই সাধারণ পানীয় জমজমের পানির মত বিশুদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণ যে কোন পানির সাথে জমজমের পানি মেশালে সেই পানীয় জমজমের পানির গুণাগুণ অর্জন করে। বিশ্বের অন্য কোন পানিতে এ ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায় না।
পবিত্র কাবা শরীফের চারদিকে যে মসজিদ রয়েছে সেটি মসজিদ-আল-হারাম নামে পরিচিত। সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত এই মসজিদটিতে প্রতিবছর হজের মৌসুমে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব সমাবেশ ঘটে।
ইসলাম ধর্মের সর্বাধিক পবিত্র স্থান মসজিদুল হারাম।

কোন মন্তব্য নেই
tnx