Ads

Breaking News

মিয়ানমারের নেপিডো শহর যেন ভূতের শহর

 মিয়ানমারের নেপিডো শহর যেন ভূতের শহর


প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি । তার চেয়েও বড় কথা মিয়ানমারের রাজধানী সম্পর্কে আমরা বলতে গেলে কিছুই জানি না । অনেকে হয়তো এর নামও শুনিনি মিয়ানমারের রাজধানীর শুধু আমাদের নয় সমগ্র পৃথিবীর কাছেই অজানা।  বলা হয়ে থাকে নেপিডো পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভট রাজধানী শহর । বিশাল আয়তনের এই শহরের মানুষের বসবাস নিতান্তই হাতেগোনা সেজন্য একে ভূতের শহর বলা হয় । এই শহরটির সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে নিরর্থক মেগা প্রজেক্ট গুলোর মধ্যে অন্যতম ।

নেপিডো বিমানবন্দর

বন্হু আগে থেকেই এই অঞ্চল বার্মা নামে পরিচিত ছিল।  অতীতে বার্মা রাজ্যের রাজধানী ছিল রেঙ্গুন ।হাজার ১৯৮৯ সালে বার্মার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মিয়ানমার ।তখন দেশের রাজধানীর নাম পরিবর্তন করা হয় রেঙ্গুন থেকে হয়ে যায় ইয়াঙ্গুন । এরপর শুধু নাম ই নয় ভৌগোলিকভাবে ও দেশটির রাজধানী পরিবর্তিত হয়েছে । বর্তমান মিয়ানমারের রাজধানীর নাম নেপিডো। নতুন রাজধানীর অত্যন্ত গোপনে শূন্য থেকে গড়ে তোলা হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার ২০০২ সাল থেকে নতুন রাজধানী নির্মাণের কাজ শুরু করে । কিন্তু মিয়ানমারের নেতারা তাদের রাজধানী বাতিলের সিদ্ধান্ত জনগণকে জানাই ২০০৫  সালে তখনো নতুন রাজধানীর নাম গোপন রাখা হয় । সেই ঘোষণার ৪ মাস পরে জানানো হয় নতুন রাজধানীর নাম সেই নতুন নামটি হল নেপিডো  যার অর্থ রাজাদের বাসভূমি। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে মিয়ানমার সরকার নেপিডোকে রাজধানীর মর্যাদা দেয় তবে শহরটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১২ সালে। নেপিডো  কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নামের একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক বিভাগে শহরটির অবস্থান ।

রেঙ্গুন


শহরের আয়তন প্রায় ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার যা লন্ডন শহরের প্রায় চারগুণ বড়। নেপিডো  শহরটি পরিকল্পিত এবং সাজানো-গোছানো । অনেকটা অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরা এবং ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া মত । রাজধানী পরিবর্তনের বিষয়টি মিয়ানমারেই প্রথম ঘটেনি অতীতেও নানা কারণে নতুন শাসকের হাত ধরে বহু সাম্রাজ্যের রাজধানী পরিবর্তিত হয়েছে । আধুনিককালে পাকিস্তান নাইজেরিয়া কাজাকিস্তান ব্রাজিলের মতো দেশগুলো যথাযথ কারণে তাদের রাজধানী পরিবর্তন করেছে । কিন্তু মিয়ানমারের রাজধানী পরিবর্তনের কোন সঠিক কারণ জানা যায় না। অনেকেই মনে করেন পুরনো রাজধানী ইয়াঙ্গুনে সমুদ্রের কাছে অবস্থিত কারণে সামরিক নেতারা সমুদ্রপথের রাজধানীতে হামলা হওয়ার আশঙ্কা করছিল । অনেকে আবার মনে করেন কোন জ্যোতিষীর পরামর্শে এই রাজধানী স্থানান্তরিত হতে পারে। যদিও এগুলোর চেয়েও অনেক জোরালো কারণ এর সাবেক রাজধানীতে আছে । রেঙ্গুনে  প্রায় ৭০ লক্ষ বেশি লোক বসবাস করে শহরটি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে । তার মানে রেঙ্গুনে আর খুব বেশি খালি জায়গা অবশিষ্ট নেই একই কারণে অবশ্য বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে অন্য কোথাও সরানো উচিত বলে নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন । এছাড়া শহরের জনসংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হবার সম্ভাবনা আছে । রেঙ্গুন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনী যাতায়াতের সুবিধার কারণেই উপকূলীয় অঞ্চলে শহরটি গড়ে তোলা হয়েছিল । পরবর্তীতে এখানেই মিয়ানমারের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে জায়গাটি মিয়ানমারের এক প্রান্তে অবস্থিত এখান থেকে সমগ্র দেশ পরিচালনা করা যেকোনো সরকারের পক্ষেই বেশ কঠিন।  সে কারণেই মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরা দেশটির রাজধানী অনেকটা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের দিকে নিয়ে গেছে ।
ইয়াঙ্গুন


মিয়ানমারের নতুন রাজধানী নির্মাণের প্রকল্প অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। নেপিডো শহর গড়ে উঠতে সময় লেগেছে মাত্র ১০  বছর সে জন্য মিয়ানমারের ধারাবাহিক সরকার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে । দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো সবকিছুই আছে নেপিডো তে । এই শহরের রাস্তা গুলো ২০ লেনের হাইওয়ের মত  প্রশস্ত। শহরের ভেতর থাকা তিনটি হোটেল মোটেল জোনে ১০০ টিরও বেশি বিলাসবহুল হোটেল আছে  ।এছাড়া পর্যটকদের জন্য গলফ কোর্স এবং জাদুঘর রয়েছে । তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ইয়াঙ্গুনে থাকা মিয়ানমারের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা একটি রেপরিকাল তৈরি করা হয়েছে এখানে । ইয়াংগণে থাকা খাঁটি সোনায় মোড়া বিখ্যাত স্থাপনা নাম শ্বেডাগন প্যাগোডা । আর নেপিড'তে তৈরি নকল প্যাগোডার নাম উপত শান্তি প্যাগোডা। ৩২০ ফুট এই মন্দিরে গৌতম বুদ্ধের একটি দাঁত সংরক্ষিত আছে।

নেপিডো তে  মিয়ানমার সরকারের আইনসভা সর্বোচ্চ আদালত, রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ, মন্ত্রিসভার সরকারি বাসভবন মন্ত্রণালয়সমূহের সদরদপ্তর এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয় রয়েছে। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস নির্মাণের জন্য বহু জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত নেপিডো তে শুধুমাত্র একটি দেশের দূতাবাস রয়েছে সেই দেশটি হল বাংলাদেশ । বাংলাদেশ বাদে বাকি দেশগুলো দূতাবাস এখনো ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত রাজধানী শহরের সবকিছু থাকলেও নেপিডো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত।

আর তা হলো জনসংখ্যা নতুন এই রাজধানী শহরের মাত্র ১০ লাখেরও কম লোক বসবাস করে  ।এদের অধিকাংশই আবার রাজধানীর আশপাশের উপশহরে বাস করে। এই লোক গুলো নেপিডো গড়ে ওঠার আগে থেকেই এখানকার বাসিন্দারা ।হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে লোকজন এখানে কেন বসবাস করতে চায় না ।তার কারণ হলো অবকাঠামোগত দিক থেকে যথেষ্ট উন্নত হলেও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি কার্যকরী ও উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধার অভাবে মিয়ানমারের অধিকাংশ লোক তাদের নতুন রাজধানী শহরে বসবাস করতে চায় না। সে কারণে এই শহরটি এখন এক ধরনের ভূতের শহর হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাস করলেও তাদের পরিবার এখনো রেঙ্গুনে থাকে এখানকার জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ১৩১ জন । তার কারণ পুরো শহরের সিংহভাগ জায়গায় এখনও ফাঁকা।

২০ লেনের রাস্তা

নেপিডো  শহরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার রাস্তা অধিকাংশ রাস্তায় প্রায় ২০ লেনের হাইওয়ের  প্রশস্ত। কিন্তু এখানে গাড়ি চলাচল হয় না বললেই চলে । অনেক ক্ষেত্রেই শহরের একটি অবকাঠামো থেকে আরেকটি অবকাঠামোতে যেতে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগে । আর যাবার পথে প্রশস্ত রাস্তার পাশের চোখে পড়ে গ্রামের দৃশ্য । নেপিডো শহরে একটি বিমানবন্দর আছে এই বিমানবন্দরটির প্রতিবছর প্রায় ৩৫  লক্ষ জাতিকে সেবা দিতে পারবে।  কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও হাতে গোনা মাত্র ১০-১২ জন লোক বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে । মূলত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের যাতায়াতের কাজেই এয়ারপোর্ট ব্যবহৃত হয় । এখানকার শপিংমলগুলো একইরকম থাকা শুধুমাত্র কূটনৈতিক ব্যক্তিদেরকেই এখানে শপিং করতে দেখা যায় । নেপিডো বিলাসবহুল হোটেল গুলো এগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে থাকে । প্রকৃতপক্ষে বহু অর্থে নির্মিত এই রাজধানী শহর মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। যদিও অনেকেই নেপিডো উন্নত ভবিষ্যৎ দেখছেন কারণ শহরটি তৈরি করা হয়েছে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে । অদূর ভবিষ্যতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটলে শহরটি মিয়ানমারের জন্য বেশ কার্যকরী আবাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে । হয়ত তখন নেপিডো ভূতের শহর বলার হাত থেকেও মুক্তি পাবে ।

কোন মন্তব্য নেই

tnx