স্টারলিংকের ইন্টারনেট ভবিষ্যতে কেমন হবে | What will Starlink's Internet look like in the future | Need to know
স্টারলিংকের ইন্টারনেট ভবিষ্যতে কেমন হবে
ইন্টারনেটের এই যুগেও বহু মানুষ ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্বের মোট 790 কোটি মানুষের মধ্যে 460 কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তার মানে বর্তমান পৃথিবীর প্রায় 40 শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সেবার আওতার বাইরে রয়েছে। প্রায় অর্ধেক লোক ইন্টারনেট বঞ্চিত থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পৃথিবীর সব জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সহজে ইন্টারনেট-সেবা দেওয়ার জন্য বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক তার স্টারলিংক ইন্টারনেট কোম্পানির যাত্রা শুরু করেছেন। স্টার লিংকের উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর নিকট মহাকাশে প্রায় 42 হাজার স্যাটেলাইট স্থাপন করে আমাদের প্রতিটি কোনায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা।
সমগ্র পৃথিবীর মূল ধারার ইন্টারনেট ব্যবস্থা সমুদ্রের নিচ দিয়ে স্থাপিত তারের সাহায্যে যুক্ত। এইসব তাকে বলা হয় সাবমেরিন ক্যাবল। সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ব্যয়বহুল এবং এসব কেবল এ নিয়মিতই নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পৃথিবীর বহু জায়গায় এসব সাবমেরিন কেবল পৌঁছানো সম্ভব নয়। সে কারণে বহু দুর্গম এবং অন্যান্য এলাকা ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত।
এছাড়া গ্রামাঞ্চলেও ওয়ারলেস ইন্টারনেট কানেকশন প্রদান করা খুব বেশি সহজ নয়। এই সমস্যার সমাধান করা যায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অতীতে বেশ কিছু কোম্পানির ইন্টারনেট প্রদান করেছে। এই কাজে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে প্রায় 36 হাজার কিলোমিটার দূরের কক্ষপথের স্থাপন করা হতো। কিন্তু সেসব স্যাটেলাইট এর বেশ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পৃথিবী থেকে অনেক দূরে হবার কারণে এগুলোর তথ্য আদান প্রদান ক্ষমতা বেশ দুর্বল। একেতো ধীর গতির ইন্টারনেট তার উপর ইন্টারনেটের খরচ অনেক ব্যয়বহুল। সে কারণে এসব ইন্টারনেট ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো বটেই বেশিরভাগ ছোটখাটো কোম্পানির পক্ষেও এসব স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।আর এখানেই ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।
তিনি কম খরচে দ্রুত গতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেট-সেবা দেওয়ার জন্য স্টারলিংক প্রজেক্ট শুরু করেন। এই প্রজেক্ট এর অধীনে প্রায় 42 হাজার স্যাটেলাইট দিয়ে কৃত্রিম উপগ্রহের তারকামন্ডল তৈরি করা হবে। যার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি কণা দ্রুতগতির ইন্টারনেট এর সাহায্যে যুক্ত থাকবে।
প্রচলিত ইন্টারনেট স্যাটেলাইট গুলোর তুলনায় স্টারলিংকয়ের স্যাটেলাইট পৃথিবীর প্রায় 65 গুন কাছাকাছি অবস্থান করবে। স্টারলিং স্যাটেলাইটগুলো 300 থেকে 1 হাজার কিলোমিটারের মধ্যে থাকা কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। এত কাছে থাকার কারণে এদের ইন্টারনেটের গতি হবে অনেক বেশি। এছাড়া এসব স্যাটেলাইট এর অধিক সংখ্যার কারণে পৃথিবীর সব জায়গায় সব সময় দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। স্টারলিংক স্যাটেলাইট গুলো লেজারের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করবে এর ফলে স্যাটেলাইটগুলো আলোর গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। স্টারলিংকের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় তাদের ইন্টারনেটের সংযোগে প্রায় 100 থেকে 200 এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট পাওয়া যাবে। গ্রাহককে স্টারলিং ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য একধরনের ট্রান্সপার বা এন্টেনা ব্যবহার করতে হবে। এদেরকে বলা হয় স্টারলিংক টার্মিনাল।
এগুলো স্যাটেলাইট টেলিভিশন এর ডিস অ্যান্টেনার মত কাজ করে। এসব অ্যান্টেনার তার একটি ওয়াইফাই রাউটারের সাথে যুক্ত করতে হয়। এরপর সেই রাউটার থেকে স্টারলিং ইন্টারনেটে দ্রুত গতির সংযোগ পাওয়া সম্ভব। স্টারলিং টার্মিনাল খোলা আকাশের নিচে স্থাপন করতে হয় যাতে সরাসরি মহাকাশে থাকার স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এসব অ্যান্টেনার সাথে বিশেষ ধরনের মোটর লাগানো থাকে যার সাহায্যে টার্মিনাল নিজে নিজেই স্যাটেলাইটের অবস্থান এর সাথে রিসিভারের দিক পরিবর্তন করতে পারে।
এখনো পর্যন্ত স্টারলিংক প্রায় 2 হাজারের বেশি স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করেছে। এগুলোর মাধ্যমে আপাতত আমেরিকা, কানাডাসহ অল্প কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা যাওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে 12000 স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হলে স্টারলিং সমগ্র পৃথিবীতে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারবে এবং স্টারলিংয়ের ইন্টারনেট সেবা সর্বোচ্চ সুবিধাজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে যখন তারা 42000 স্যাটেলাইট মহাকাশে স্থাপন করতে পারবে। তখন হয়তো স্টারলিং ইন্টারনেট সাবমেরিন ক্যাবল এর চেয়েও দ্রুতগতির সংযোগ প্রদান করবে।
2019 সালের অক্টোবরে ইলন মাস্ক সর্বপ্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করে একটি টুইট করেন। তার পরের বছর 2020 সালের অক্টোবরে স্টারলিংক পরীক্ষামূলক ভাবে তাদের গ্রাহকদের সেবা প্রদান শুরু করে। প্রথমদিকে টার্মিনাল কিন্তু 499 ডলার বা প্রায় 43 হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে এবং এই ইন্টারনেটের মাসিক খরচ ধরা হয়েছে 99 ডলার বা প্রায় 8.50 হাজার টাকা। ধীরে ধীরে স্টারলিংকয়ের সমস্ত স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হলে এবং তাদের সেবার পরিষদ আরো বিস্তৃত হলে এর দাম অনেক কমে যাবে। অনেকেই ধারণা করছেন ইলন মাস্ক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম দামে ইন্টারনেট সেবা দিতে পারেন। শুরুর দিকে দুর্গম এলাকায় ইন্টারনেট-সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলেও ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই
tnx