বাংলাদেশ কি শ্রীলংকার মত দেউলিয়া হয়ে যাবে (Will Bangladesh go bankrupt like Sri Lanka)
প্রথমে জানা যাক দেউলিয়া বলতে আসলে কি বোঝায়(Let us first know what is meant by bankruptcy):
দেউলিয়ার শব্দের সাধারণ অর্থ হল দেনা পরিশোধ করতে অক্ষম বা নিঃস্ব। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন পাওনাদার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয় তখন উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়। দেউলিয়া শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Bankruptcy ইতালি ও শব্দ Banca Rotta থেকে এসেছে। যার অর্থ (Broken Bench)বা ভাঙা বেঞ্চ।
প্রাচীনকালের শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগকারী অর্থলগ্নিকারী এবং অর্থ বিনিময় বেঞ্চ পেতে বসতেন এবং মানুষকে সুদে টাকা ধার দিতেন অথবা তাদের বৈদেশিক মুদ্রা পরিবর্তন করে দিতেন। আধুনিককালের ব্যাংক শব্দটিও সেই ইতালিয়ান বেঞ্চ শব্দ থেকেই এসেছে। ভেনিসের কোন অর্থ বিনিময়কারী যদি তার দেনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হতো তবে তার বেঞ্চটি ভেঙে ফেলা হত। তখন থেকে দেউলিয়া বোঝাতে Bankruptcy বা Banca Rotta শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এভাবেই দেউলিয়া হবার মতো বিষয়টির উৎপত্তি ঘটে ।
 |
| Bandeshi Taka |
অতীতের সমৃদ্ধ দেশ লেবানন সম্প্রতি নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। আমাদের আরেক প্রতিবেশীদের শ্রীলংকা নিজেদেরকে ঋণখেলাপি ঘোষণা করেছে। তারাও কার্যত এক প্রকার দেউলিয়া শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করার বাকি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকার অবস্থা এক সময় বেশ ভালো ছিল কিন্তু অতিরিক্ত বিদেশি ঋণের ভারে দেশটির অর্থনীতি আজ ভারাক্রান্ত। এসব অবস্থা দেখে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে বাংলাদেশের অনেক বিদেশী ঋণ আছে তাহলে বাংলাদেশকে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে ।
 |
| Sri-lanka Rupee |
সাধারণত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়ে থাকে( Individuals and organizations are usually declared bankrupt)
এই দুই ধরনের সরকার দেউলিয়াত্বের জন্য বিভিন্ন দেশে আলাদা আলাদা আইন রয়েছে। বাংলাদেশের দেউলিয়া বিষয়ক আইন আছে। তবে দেউলিয়া শব্দটি কখনো কখনো দেশের জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একটি দেশ কিভাবে দেউলিয়া হয়ে যায় কর্পোরেট ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের মহারাষ্ট্র তখনই হয় যখন তার সরকার নির্ধারিত সময়ে ঋণ ও অন্যান্য প্রদেয় বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়। সাধারণত কোন দেশের সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব সংঘটিত হলে রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
বিধায় সরকারের আর্থিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বড় পাওনা পরিশোধ বাতিল করে নতুন সরকার দেশকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারেন। এছাড়া কোন দেশের কাছে সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় সে গুলোকে রূপান্তর করা যায় না। তখন তারল্য সংকটের কারণে কোন দেশ দেউলিয়া হতে পারে।এছাড়া সরকারের আর্থিক অসচ্ছলতা ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকা, খেলাপি ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কারণে কোন দেশ দেউলিয়া হতে পারে। কোন রাষ্ট্র যদি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন তবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মতো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নিলামে ওঠে না। কোন কোম্পানি দেউলিয়া হলে তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করতে পারে আদালত। তবে রাষ্ট্র দেউলিয়া হলে আদালতের সেই ক্ষমতা আর নেই। ইন্ডিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রাষ্ট্র দেওলিয়া হয়ে যাওয়া প্রকৃত অর্থে একটি ভুল ধারণা। যখন একটি দেশ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় তখন দেশটি মোটেও দেউলিয়া হয়ে যায় না তখন দেশটি হয় ঋণখেলাপি। তবে বহু দেশেই তাদের ইতিহাসে কোনো না কোনো সময়ে ঋণখেলাপি হয়েছে। এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ।

সাম্প্রতিক সময়ে লেবানন কিংবা শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে রাষ্ট্রের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিল 377 সালে ঘোষণা করা হয়েছিল। গত দুই বছরে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক বেশ আফ্রিকার 40% দেশ এবং এশিয়ার প্রায় 30 ভাগ নানান সময়ে দেউলিয়া হয়েছে। এই তালিকায় কিন্তু শুধু দুর্বল অর্থনীতির দেশ নয় যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য রাশিয়া জার্মানি জাপান ব্রাজিল এবং চীনের মতো দেশ অতীতে দেউলিয়া হয়েছে। করণা মহামারীর কারণে গত বছর ব্রাজিল নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার দেউলিয়া হয়েছে ইকুয়েডর দেশ দশবার নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে ।
এবার আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে, শ্রীলংকার অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ নিয়োগ প্রশ্ন হচ্ছে কারণ শ্রীলংকার এই বেহাল দশার পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এর মতে কোন দেশের ঋণের হার সেদেশের জিডিপির ৫৫ শতাংশ বেশি হলেই অর্থনীতি দেউলিয়া বিপদে পড়তে পারে। অর্থমন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণের হার জিডিপির ৩৮ শতাংশ। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী শ্রীলংকার বর্তমান ঋণের হার জিডিপির ১১৯ শতাংশ।
অর্থাৎ দেশটির সবমিলিয়ে এক বছরে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা উতপাদন করে তার তুলনায় শ্রীলংকার ঋণ অনেক বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ধরে হিসাব করলে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ
২৯২.১১ ডলার। সেখানে শ্রীলংকার মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ
১৬৫০ ডলার ।বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পণ্য রপ্তানি থেকে ৪.৭৬ বিলিয়ন ডলার আয় করছে বাংলাদেশ। সেখানে শ্রীলংকা পণ্য রপ্তানি থেকে আয় করছে মাত্র ১.১ বিলিয়ন ডলার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়লেও বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের বই মুদ্রার রিজার্ভ আছে
৪৪.৪০ বিলিয়ন ডলার।সেখানে শ্রীলংকার রিজার্ভ আছে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফ এর তথ্য বলছে, চলতি বছরে শ্রীলঙ্কা ৫০০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু শ্রীলংকা দের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা আছে মাত্র ২৩০ কোটি ডলার। তাহলে ঋণ পরিশোধে করা তো দূরের কথা দৈনন্দিন কাজ চালাতে শ্রীলংকার নতুন করে ঋণ করতে হচ্ছে। সুতরাং শ্রীলংকার সাথে বাংলাদেশের তুলনা করে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন আমাদের অর্থনীতির আপাতত চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু নেই।
বাংলাদেশের দেউলিয়া হবার সম্ভাবনা না থাকলেও সংকট এড়িয়ে চলার ব্যাপারে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন। শ্রীলংকার সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। অতীতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় ছিল সবার চেয়ে বেশি। তাই বাংলাদেশে কেউ সাবধান হতে হবে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শ্রীলংকা বিপাকে পড়েছে। গত ১৫ বছরে দেশের সমুদ্র বন্দর বিমানবন্দর রাস্তাঘাটসহ বহু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হলেও অনেক প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়নি। বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হল প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা। যেমন পদ্মা সেতু প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে কিন্তু সেতু শেষ করতে খরচ হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বাংলাদেশের দশটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে এর একটি কাজ সময়মতো শেষ হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বেশি ব্যয় বেড়েছে। এতে করে এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্য কমে যাচ্ছে।
বড় বড় প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের ঋণের দায় আগের চেয়ে বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য মতে
২০০৯-১০ অর্থ বছরে বাংলাদেশের পরিশোধ করতে হয়েছিল
৮৭ কোটি
৬০ লাখ ডলার।
২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে
১৯১ কোটি ডলারে। আগামীতে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প গুলোর কাজ শেষ হলে এই ঋণ পরিশোধের গায়ে অনেক বেড়ে যাবে। এছাড়া বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে গেলে আগামীতে আর কম সুদে ঋণ পাওয়া যাবেনা। তখন আরো বেশি সুদে ঋণ নিতে হবে সেই সাথে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বিলুপ্ত হবে। এখন থেকেই ঋণের দায় নিয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে। সেইসাথে শ্রীলংকার ভুল থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নিতে হবে শ্রীলংকার ভুল কর নীতি রাজস্য আসে না। এমন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কারণে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকট সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান দেশটি এখন চরম আর্থিক ও মানবিক সংকটে পড়েছে শ্রীলংকা।
কোন মন্তব্য নেই
tnx